“ফিতরা বা সাদাকাতুল ফিতর সম্পর্কিত আলোচনার প্রথম পর্ব”

” বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম “


ভূমিকা ⠅ পবিত্র দ্বীন ইসলামের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ হল ফিতরা বা সাদাকাতুল ফিতর। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এবং হুযুর পূর নুর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে প্রত্যেক স্বাধীন মুসলমান নর নারীর তথা নির্বিশেষে সকল মুসলমানের উপর নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার শর্তে ” ফিৎরা বা সাদাকায়ে ফেতর ওয়াজিব করা হয়েছে।


ফিতরা / ফেৎরা / সাদাকাতুল ফিতর এর পারিভাষিক অর্থ ⠅ পবিত্র রমাদ্ব’নুল মুবারক (রমযান) মাস শেষ হওয়ার পরে ঈদুল ফিতরের দিন ‘পবিত্র কুরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফ মোতাবেক যে নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদ শর্ত সহকারে দান করা হয় তাকে সাদাকাতুল ফিতর বলে। মোট কথা ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় হাদীস মোতাবেক নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদের মালিক হওয়ার কারনে যে সদকা করতে হয় তাকেই সদাকতুল ফিতর বলে।
[বিভিন্ন স্থানের দেশীয় প্রচলিত ভাষা অনুযায়ী “ফিতরা / ফিৎরা / ফেতরা / ফেৎরা / সাদাকায়ে ফেতর / ছাদাকায়ে ফিতর / ছাদাকাতুল ফিতর / সাদাকাতুল ফিতর” দ্বারা একই জিনিষ কে বুঝানো হয়ে থাকে]

ফিৎরা / ফেতরা / সাদাকায়ে ফেতর এর হুকুম ⠅ পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র হাদীস শরীফ মোতাবেক ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় নির্দিষ্ট পরিমান ধন সম্পদ টাকা পয়সা সোনা রূপা ইত্যাদির মালিক হওয়ার শর্তে বালেগ / নাবালেগ সহ নির্বিশেষে সকল মুসলমান নর ও নারীগনের উপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে।
*ইমাম আবু হানীফা (র) এর মতে , সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব।
* আল্লামা তিবী (র) এর মতে , সাদাকাতুল ফিতর ফরয।
*ইমাম শাফেয়ী (র) এর মতে , সাদাকাতুল ফিতর ফরয।

সাদাকাতুল ফিতর কার উপর ওয়াজিব ⠅ ইসলামী শরীয়তের হুকুম অনুযায়ী প্রত্যেক স্বাধীন নাবালেগ / বালেগ পুরুষ / মহিলা নির্বিশেষে শর্ত সাপেক্ষে সকল মুসলমানের উপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। তবে শর্ত এই যে ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের পূর্বে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে। ওয়াজিব না হওয়া সত্বেও আপন খেয়াল খুশি থেকে ফিতরা আদায় করলে তা মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হবে এবং অনেক বেশী সওয়াব হবে। কারন, হাদীস শরীফে এসেছে ‘গরীব হওয়া সত্বেও কষ্ট করিয়া যে আল্লাহর রাস্তায় সদকা দেয় , তাহার দান কে আল্লাহ রব্বুল আলামীন অনেক পছন্দ করেন।

যে পরিমাণ সম্পদ থাকিলে সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় ⠅ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় যে ব্যক্তি হাওয়ায়েজে আছলিয়া অর্থাৎ, জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরন “যেমনঃ পোশাক পরিচ্ছেদ, বাসস্থান, খাদ্য দ্রব্য,  যে জিনিসের নির্ভর করে সংসার চলে তা ব্যতীত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ন বা সাড়ে ৫২ তোলা রূপা অথবা সমমূল্যের অন্য কোন সম্পদ, টাকা পয়সা থাকিবে তাহার উপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হইবে। সেই মাল সম্পদ ব্যবসার জন্য হউক বা না হউক, বা সেই সম্পদের বয়স পূর্ন এক বছর হউক বা না হউক। [জীবিকা নির্বাহের আবশ্যকীয় উপকরনসমূহকে “হাওয়াজে আছলিয়া” বলে। ///// ২০০ দেরহাম পরিমাণ সম্পত্তির অধিকারীকে মালেকে নেছাব বলে, আমাদের দেশীয় হিসাব অনুযায়ী ২০০ দেরহামে সাড়ে ৫২ তোলা রূপ হয়।]

যাদের পক্ষ থেকে আপনাকে সাদাকাতুল ফিতর / ফেৎরা আদায় করতে হবে ⠅ ইসলামী শরীয়তের হুকুম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরীমান সম্পদের মালিক হওয়ার শর্তে যার উপর ফিতরা ওয়াজিব হয়েছে ‘তিনি নিজের পক্ষ থেকে, তার নাবালেগ ছেলে মেয়ের পক্ষ থেকে, ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পূর্বে যে সন্তান জম্ম নিয়েছে তার পক্ষ থেকে, আপন ঘরের কাজে নিযুক্ত গোলামের পক্ষ থেকে এবং বাড়িতে কোন অমুসলিম গোলাম থেকে থাকলে তার পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর বা ছদ্ক্বায়ে ফেৎর আদায় করতে হবে।

যাদের পক্ষ থেকে আপনার উপর ফেৎরা / ছদাকতুল ফিৎর আদায় করা ওয়াজিব নয় ⠅ আপন স্ত্রীদের এবং আপন ঔরসজাত প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়েদের পক্ষ থেকে সদাকতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নহে। তবে পুরুষ ব্যক্তি ইচ্ছা করিলে তাহার স্ত্রী, এক পরিবারভুক্ত থাকিলে তাহার প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে / মেয়ে, এবং আপন পিতা মাতার পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে পারবে, এটা মুস্তাহাব।
[মেয়েলোকের শুধুমাত্র নিজের ফেতরা দেয়া ওয়াজিব। স্বামী, সন্তান, বাবা, মা এবং অন্য কাহারো পক্ষ থেকে ফিৎরা আদায় করা ওয়াজিব নহে।]

সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা কাকে দিতে হবে ⠅ আপন আত্মীয় – স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী বা দূরবর্তী লোকদের মধ্যে যাহারা ফকির , মিসকিন , গরীব – দুঃখী আছে তাহাদেরকে দিতে হবে। আলেম উলমা, ইমাম, মোয়াজ্জিন, যদি গরীব হয় দেয়া যাবে। একজনের ফিতরা একজনকে অথবা কয়েকজনের ফিতরা একজনকে কিংবা একজনের ফিতরা কয়েকজনকে উভয়ই জায়েয। তবে খেয়াল রাখতে হবে কাউকে এত বেশি দেয়া যাবেনা যে, যার ফলে উল্টো গ্রহনকারীর উপরই যেন সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়ে যায়।

সাদাকাতুল ফিতর কখন দিতে হবে ⠅ ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা মুস্তাহাব। যদি একান্ত আগে নাই দিতে পারে তবে পরে দিলেও হবে। আবার কেহ যদি রমযান মাসেই ফিতরা দিয়ে দেয় তাও জায়েয হবে। যদি যথা সময়ে ফিতরা না দেয় ওয়াজিব হিসেবে তা ঝুলন্ত থাকবে, অবশ্যই তা আদায় করতে হবে, আদায় না করা পর্যন্ত তা মাপ হবেনা।

যাদের কে ফিৎরা দেয়া জায়েয নেই ⠅ নবী বংশ তথা সাইয়্যেদগন কে, “সম্পদশালী লোক এবং তাহাদের নাবালেগ সন্তানদের কে, এবং “নিজের বাবা, মা, দাদা, দাদী, নানা, নানী, নিজের ছেলে মেয়ে, নাতি, নাতনী ইত্যাদিগকে ফিতরা বা যাকাত দেয়া জায়েয নেই। তারা যদি গরীব হয় নিজের সম্পদের থেকে ভাগ / হাদিয়া – তোহফা দিয়ে সহযোগীতা করতে হবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কতৃক নির্ধারিত ২০১৮ – 2018 সালের সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরার পরিমাণ এবং যে সকল জিনিষ দিয়ে ফিতরা দেয়া যাবে ⠅
১/ আটা দিয়ে যদি কেহ ফিতরা আদায় করতে চায় তাহলে ” অর্ধ সা বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল্য হিসেবে ৭০ টাকা জনপ্রতি দিতে হবে।
২/ যব দ্বারা যদি ফিৎরা আদায় করতে চায় তাহলে ” এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার দর হিসেবে জনপ্রতি ৫০০ টকা করে দিতে হবে।
৩/ কিসমিস দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চাইলে, এক সা বা ১ কেজি ৩০০ গ্রাম বা তার সর্বোচ্চ বাজার মূল্য ১৩২০ টাকা করে জনপ্রতি দিতে হবে।
৪/ খেজুর দ্বারা ফেৎরা আদায় করতে চাইলে জনপ্রতি ” এক সা বা ১ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল ১৯৮০ টাকা কর প্রদান করিতে হইবে।
৫/ পনির দিয়ে যদি আপনি ফিতরা আদায় করতে চান তাহলে ” এক সা বা ১ কেজি ৩০০ গ্রাম বা তার সর্বোচ্চ বাজার মূল্য ২৩১০ টাকা করে জনপ্রতি আদায় করতে হবে।

বিঃ দ্রঃ – উপরোক্ত পণ্যসমূহের দাম স্থান কাল ভেদে পরিবর্তন হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় দাম অনুযায়ী উপরোক্ত নিয়মে হিসেব করে ফিত্বরা আদায় করলে তা জায়েয হবে।
 ✱ এছাড়া মনে রাখতে হবে, আপনার যদি পনির বা তার সমমূল্য ২৩১০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করার যোগ্যতা থাকে তবে অন্য কিছু দিয়ে ফিতরা আদায় করা উচিৎ হবেনা।
✱ আপনার যদি পনির বা সমমূল্য ২৩১০ টাকা দেয়ার মত সক্ষমতা না থাকে , কিন্তু খেজুর বা সমমূল্য ১৯৮০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ের সক্ষমতা থাকে তবে তাই দিয়ে দিবেন। এর চেয়ে কম মূল্য / জিনিষ দিয়ে আদায় করা ঠিক হবেনা।
✱ এভাবে কিসমিস / ১৩২০ টাকা দিতে পারলে তাই দিতে হবে। এর চেয়ে কম মূল্যের জিনিষ দেয়া উচিৎ হবেনা।
✱তেমনি ভাবে জব / ৫০০ টাকা দিতে পারলে তাই দিতে হবে। এর চেয়ে কম মূল্যের জিনিষ দিবেননা।
✱ আর যদি আটা দ্বারা ফিতরা আদায়ের যোগ্যতা থাকে তাই দিবেন, তবে এর চেয়ে দামি জিনিষ / মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতে পারলে অধিক সওয়াব হবে। কারন, হাদীস শরীফে সর্বোত্তম দামি মাল দ্বারা ফিতরা আদায়ের তাগিদ করা হয়েছে।


সাদাকাতুল ফিত সম্পর্কিত হাদীস শরীফ সমূহ ⠅
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা) বলেন , নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকায়ে ফিতর খেজুর ও যবের এক সা পরিমানে দাস, স্বাধীন, নারী, পুরুষ, ছোট, বড় সকল মুসলমানের উপর ফরজ করেছেন এবং ঈদগাহে যাবার পূর্বেই সদকায়ে ফিতর আদায়ের নির্দেশ করেছেন।


দলীলঃ
১/ তাহসীনুল কুদুরী।
২/বেহেশতী জেওর


================================================================================================================================================


Introduction ⠅ Sacred Religion is one of the important parts of Islam, Fitra or Sadakat-ul-Fitr. On behalf of Allah Almighty and Huzur the Prophet Nur (peace and blessings of Allaah be upon him), every independent Muslim, on the condition of being the owner of a certain amount of wealth, regardless of women, regardless of women, “Fitra or Sadat-e-Fitr was obliged.




The technical meaning of Fitra / Fitra / Sadakat-ul-Fitr is that after the end of the month of Ramadan Mubarak (Ramadan), the specific amount of wealth that is given in accordance with the holy Qur’an and the hadith according to the tradition of Eid al-Fitr is called Sadakat-ul-Fitr. According to the fact that on the occasion of Eid al-Sadik, as the owner of a certain amount of wealth, according to the hadith, he is the person who has to do the charity, he is also called Sadaktul Fitr.